স্টেশনের রেলগাড়িটা
"আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার বাল্য বিবাহ কি তাঁর শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল?"
গন্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিতাসের (ট্রেনের নাম) অপেক্ষায় অপেক্ষমান আমি। দশটার ট্রেন সাড়ে দশটা নাগাদ পৌঁছা খুব স্বাভাবিক। কারণ এটা বাংলাদেশ। এখনও আধ-ঘন্টা বাকি। এত সময় দাড়িয়ে না থেকে বসা প্রয়োজন। এমনটাই ভাবছিলাম অমনি খানিক দূরে তিন আসনের এক লম্বা চেয়ার নজরে পড়ল। কাল বিলম্ব না করে ঐ প্লাটফর্ম-চেয়ারের এক কোণে চেপে বসলাম। কিছুক্ষণ চুপটি মেরে বসে রইলাম।
খানিক বাদে আবির্ভাব ঘটলো এক সুদর্শন যুবক ও দুই সুন্দরী যুবতীর। লিফলেট বিলি করছিলো ওরা। মিলেমিশে। একসাথে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ওদের চোখেমুখে প্রত্যয়। দৃঢ় প্রত্যয়। সাথে আগামীর অঙ্গীকার। কী অঙ্গীকার সেটা এখনও জানিনা আমি। আশেপাশের সবাইকেই ওরা লিফলেট/কার্ড দিলো। শুধু দিলোনা এই কবিকে।
কবির চোখেমুখে তখন বিস্ময়ের ছাপ। হৃদয়ে কৌতূহলী উত্তাপ। আগ্রহী মন আর তর সইলনা। সাথে সাথে জানতে চাইল সে। ছুড়ল প্রশ্নের তীর।
— "সবাইকেই লিফলেট দিচ্ছেন আমাকে দিচ্ছেন না কেন? আমাকেও একটা দিন!"
দুই রমণীর মধ্যমণি যুবক এবার আমার দিকে দৃষ্টি দিল। হ্যাঁ, এ দৃষ্টি তাচ্ছিল্যের। তিরস্কারের। ভর্ৎসনার। তৎক্ষণাৎ এক গাল ক্ষোভের হাসি আমাকে উপহার দেয় সে। তার সঙ্গ দেয় দুই সুন্দরী নারী। না অতটা সুন্দরী না যতটা কবিরা ফুটিয়ে তুলে তাঁদের লেখায়।
— "আপনাকে দেব? আমরা কী দিচ্ছি জানেন আপনি?" (যুবকের প্রতিউত্তর)
— "না দিলে জানব কি করে?"
— "আমরা যে লিফলেট বিলি করে বেড়াচ্ছি তা শিশুশিক্ষা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে। আমাদের স্লোগান এখানে বড় করেই লিখা আছে—'প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করি। নিরক্ষর মুক্ত দেশ গড়ি।'"
তৎক্ষণাৎ বুঝে নিলাম, ওদের অঙ্গীকার শিশুশিক্ষা ও বাল্য বিবাহ রোধের অঙ্গীকার। তাই আমিও গিরগিটির মত রূপ বদলে নিলাম। বললাম,
— "আমিও আপনাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করতাম! যদি…..।"
— "কিভাবে করতেন? আপনারা তো মুহাম্মদের উম্মত বলে দাবি করেন নিজেদের। যে কিনা নয় বছরের শিশু আয়েশার সঙ্গে মজা লুটেছে। শিশুদের থেকে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আর শিশুবিয়ে বৈধ করেছে। এমনকি এই নিচুমানের কাজ করতে তোমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে সে। শিখিয়ে গেছে। আগ্রহী করে তুলেছে। তোমাদের নবি'ই তো নারীশিক্ষার পথ চিরকালের জন্য বন্ধ করে গিয়েছে। আর সেই নবীর উম্মত বলে গর্ববোধ করা তোমার মত কাঠমোল্লাকে আমি লিফলেট দিব? এটা ভাবলে কী করে?"
যুক্তি আছে যুবকের কথায় মানতেই হয়। তাইতো! সে আমাকে কেন লিফলেট দিবে? কিন্তু আমি তো হেরে যাবার জন্য জন্মাইনি। গিরগিটির মত আরেকবার রঙটা বদলে নিলাম। কথার মোড় ঘুরিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লাম।
ইতিহাসের তুলনামূলক আয়না
— "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনেন?"
— "আমার গুরু। চিনবনা আমি! আশ্চর্য!" (যুবকের উত্তর।)
— "তার স্ত্রীর নাম মৃণালিনী দেবী। অ্যাম আই রাইট?"
— "হ্যাঁ মৃণালিনী দেবী। তো কি হয়েছে?"
— "ঠাকুরের বিবাহকালে মৃণালিনী দেবীর বয়সটা কত ছিল জানেন?"
মুখটা খড়পুড়ানো পাতিলের তলার ন্যায় হয়ে যায় যুবকের। অমাবস্যার সবটুকুন আঁধার কেড়ে নিয়ে বলে, "আমি জানিনা।"
— "ইটস ওকে। আই অ্যাম টেলিং ইউ ব্রো। নয় বছর। সেই একই নয় বছর। যে বয়সে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে বিয়ে করার কারণে আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দোষারূপ করছেন। তো এখন আমার প্রশ্ন হল, বাল্য বিবাহের কারণে যদি মুহাম্মদ এক খলনায়কের নাম হয় তাহলে একই কাজ করে ঠাকুর মশাই কেন মহানায়ক থাকবেন? উভয়ের ক্ষেত্রেই সমতা আনুন! নাকি রংবাজ কৃষ্ণের লীলাখেলার মত আপনার গুরুর মন্দ কাজকে ভাল বলবেন! 'কৃষ্ণ করলে লীলাখেলা আমরা করলেই দোষ।'
এমনকি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসার বিয়ের সময় তার বয়স ছিল আট বছর। মাত্র আট। হ্যাঁ, মাত্র আট বছর। তো এই খলনায়কের তালিকায় শেখ মুজিবের নামটাও আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। তাই নয় কি? একজনকে দোষারূপ করবেন আর বাকি দুজনকে মাথায় তুলে রাখবেন—এই হিপোক্রেট থিওরি কই পাইলেন? আসুন, এবার সাম্যের গান গাই এই একই জায়গায়। দেখি কার ক্ষমতা কদ্দুর?"
বেচারা আর দুই অবলা সুন্দরীর অসহায়ত্ব এবার দেখে কে? আমি থামলাম না। এবার আরও অনর্গল বলতে থাকলাম।
ইসলামের ইতিহাস কী বলে?
আচ্ছা, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি সত্যিই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন? নাকি ইসলামের ইতিহাস ভিন্ন কিছু জানান দেয় আমাদেরকে!
চলুন, এক তিক্ত সত্যের মধ্য দিয়ে সমীকরণ মিলাই।
আয়েশা (রা.)-কে বাল্য বিবাহ করে নারীশিক্ষা সুনিশ্চিত করেছেন মহানবি ﷺ। সুগম করেছেন নারীমুক্তির দুর্গম পথও। পক্ষান্তরে বাল্য বিবাহ করে নারীর শিক্ষা ও মুক্তি কোনোটাই সুনিশ্চিত করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আসুন প্রমাণ দিই।
নারী হিসেবে আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর অর্জন
বিয়ের পর তিনি ইলম অর্জন করেছেন। কোরআন পড়েছেন। হাদীস শাস্ত্রে বেশ পাণ্ডিত্যও অর্জন করেছেন। ফিকহ শাস্ত্রে বেশ অবদান রেখেছেন। সাহাবী আবু মুসা আশআরী (রা.) বলেন, যখন কোন হাদীস বুঝতে আমাদের অসুবিধা হতো আমরা সরাসরি আয়েশার কাছে চলে যেতাম। শিক্ষকতা ও ফতোয়াপ্রদান করেই জীবনের পুরো সময়টা কাটিয়ে দিয়েছেন। বড় বড় সাহাবী (রা.) তাঁর কাছ থেকে পাঠ নিয়েছেন। তিনি মদীনার সমস্ত মহিলাকুলের শিক্ষিকা ছিলেন।
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীদের মাঝে অন্যতম হলেন হযরত আয়েশা (রা.)। তিনি রাসুল ﷺ থেকে ২২১০ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে (মুত্তাফাকুন আলাইহি) ১০৭৪ টি, এককভাবে বুখারীতে ৫৪ টি এবং মুসলিমে ৫৮ টি হাদীস তাঁর সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এ তো ছিল শিক্ষাগত অর্জন। এখানেই শেষ নয়। এর বাইরে তিনি মুজাহিদা ছিলেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে জিহাদের ময়দানে গিয়েছেন। আহত সাহাবীদের চিকিৎসা করেছেন। তিনি নার্স ও একজন দক্ষ নারী চিকিৎসক ছিলেন। অস্ত্রোপচারও জানতেন।
এর মোকাবেলায় ঠাকুর মশাইয়ের স্ত্রী বাংলা সাহিত্যে কী অবদান রেখেছেন বলুন দেখি? তাঁর লেখা কয়টা কবিতা, ছড়া, গল্প, রম্য রচনা বা উপন্যাসের বই প্রকাশিত হয়েছে? একটাও না। এক লাইনও লিখেননি। লিখতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী কি এককভাবে কোনো অবদান রেখেছেন নারীকুল সমাজে? কোনোদিন ভাষণ বা মিটিং মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বুঝি? তাও না। মোদ্দাকথা; একক নারী হিসেবে কোনধরনের কোনো অবদান রাখেননি তারা। রাখতে পারেননি। আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার অবদান অনস্বীকার্য। যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
উম্মুল মুমিনীন অথবা রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী হওয়া ছাড়াও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার অর্জন অনেক। সেসব সফলতা বিবাহের পর তিনি লাভ করেছেন। পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হওয়া ছাড়া মৃণালিনী দেবীর কোনো অর্জন নেই। এবং বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী হওয়া ও সন্তান জন্ম দেয়া ছাড়া ফজিলাতুন্নেসারও কোনো অর্জন নেই। কথাটা সইতে না পারলেও এটাই সত্য। তিক্ত সত্য। মহাসত্য।
যুগের প্রচলন ও বিধানের প্রজ্ঞা
মোটা দাগে শেষ একটা কথা বলে যাই।
সেই যুগের প্রচলন অনুযায়ী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ের বয়স এমনিতেই হয়ে গিয়েছিল। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন প্রস্তাব দেন তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর দূতকে উত্তর দিয়েছিলেন, "আমি রাসুলের প্রস্তাব কিভাবে ফিরিয়ে দিই? কিন্তু আয়েশার তো এক জায়গায় কথা চলছে!" (সালেহ আহমাদ শামী কৃত মিন মাঈনিস সীরাহ দেখতে পারেন)।
এছাড়াও বর্তমান আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে পেতেন না। কারণ মহানবীর মৃত্যুকালে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার বয়স ছিল ১৮ বছর।
সারমর্ম কী দাঁড়াল?
নিজেদের নেতাদের অক্ষমতাকে ইসলামের অন্যায় বলে চাপিয়ে দেয়াটা দোষনীয়। তাই আমি বলব, বাল্য বিবাহ ঐ লোকের জন্য করা বৈধ যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে দেয়া শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে পারে। আর যদি না পারে তাহলে বাল্য বিবাহ করবে কী করবেনা সেটা সে ভেবে দেখবে।
মনে রাখবেন, ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে নারীশিক্ষা ও নারী-ক্যারিয়ারের পথটা সুগম করেছিল। সেটা বন্ধ করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের মত লোক।
এবার থ্রি-সাম যুগলবন্দীদের অসহায়ত্ব দেখার মত। যেন মুখ লুকাতে পারলেই লজ্জা থেকে বাঁচে। আহারে বেচারাত্রয়। ট্রেনের হুইসেল আমার বিতর্ক শেষ করে দিল। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথ ধরলাম আনমনে। ট্রেনে বসে বসে অনেকক্ষণ ভাবলাম, আমি ঠিকভাবে বলতে পেরেছি তো কথাগুলো!
সাইফুল ইসলাম
শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা, লেখক, ডিজিটাল ক্রিয়েটর ও পরিব্রাজক। জীবনের গভীর উদ্দেশ্য, নৈতিক উদ্যোগ ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে কাজ করতে বিশ্বাসী।