সূরা ফাতেহা পড়া ছাড়া কি জানাযার নামায বিশুদ্ধ হয় না?
ইসলামী শরীয়াহর সৌন্দর্য হলো এর দালিলিক গভীরতা এবং বিজ্ঞ ফকীহগণের চিন্তার সূক্ষ্মতা। কোনো কোনো মাসআলায় যুগের পর যুগ ধরে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার কারণে সেই মতপার্থক্যগুলো অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও পারস্পরিক দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জানাযার নামাযে সূরা ফাতেহা পাঠের বিধান তেমনি একটি বহুল আলোচিত বিষয়।
ফুকাহায়ে কেরামের মূল দুটি দৃষ্টিভঙ্গি
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং হাদীসের ভাষ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সম্মানিত ইমামগণের মধ্যে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
১. ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মত
ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মতে জানাযার নামাযে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পাঠ করা আবশ্যক (ওয়াজিব বা রুকন)।
- তাঁরা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি হাদীসকে প্রধান দলিল হিসেবে পেশ করেন, যেখানে তিনি জানাযায় উচ্চস্বরে সূরা ফাতেহা পাঠ করে বলেছিলেন: "আমি এটা এইজন্য পড়লাম যাতে তোমরা জানতে পারো যে এটি সুন্নাহ।" (সহীহ বুখারী)।
২. ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর মত
পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী জানাযা মূলত কোনো রুকু-সিজদাবিশিষ্ট নামাযের মতো নয়, বরং এটি হলো মৃত ব্যক্তির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ দু'আ ও সুপারিশ।
- তাই এই মতে জানাযায় মূল পাঠ্য হলো আল্লাহর হামদ-সানা (প্রশংসা), দুরূদ শরীফ এবং মাইয়্যিতের জন্য ইখলাসের সাথে মাগফিরাতের দু'আ করা। যদি কেউ সূরা ফাতেহা পড়েও, তবে তা যেন কুরআন তিলাওয়াতের নিয়তে না পড়ে দু'আর নিয়তে পড়ে।
"মাসআলাগত মতভেদ কখনোই হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি করার মাধ্যম নয়; বরং এটি উম্মাহর জন্য প্রজ্ঞার প্রশস্ততা।"
আমাদের করণীয় ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচ্ছন্নতা
উভয় পক্ষের কাছেই শক্তিশালী হাদীস ও যুক্তি রয়েছে। তাই কেউ যদি সূরা ফাতেহা পাঠ করেন তবে তিনি সুন্নাহর অনুসারী সাহাবীর আমল গ্রহণ করছেন, আবার যিনি পাঠ করছেন না তিনিও দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত ফিকহী মূলনীতির ওপর আমল করছেন।
জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হলো অন্তরকে বিনম্র করা—অন্যকে ভুল প্রমাণ করার অন্ধ অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সঠিক নিয়তে আমল করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সাইফুল ইসলাম
শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা, লেখক, ডিজিটাল ক্রিয়েটর ও পরিব্রাজক। জীবনের গভীর উদ্দেশ্য, নৈতিক উদ্যোগ ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে কাজ করতে বিশ্বাসী।